Home / আন্তর্জাতিক / উইকিলিকস-এর ভূমিকায় প্রশ্নবিদ্ধ ‘মার্কিন গণতন্ত্র’!

উইকিলিকস-এর ভূমিকায় প্রশ্নবিদ্ধ ‘মার্কিন গণতন্ত্র’!

a395এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাস লিখতে গেলে, উইকিলিকসকে বাদ দিয়ে তা লেখা সম্ভব নয়। মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পল রোডেরিক গ্রেগরি। কেননা তিনি মনে করছেন, নির্বাচনী প্রচারণার আয়োজন, এর অর্থায়ন, বিভিন্ন অন্যা্য় কৌশল, অর্থের ক্রীড়ানক ভূমিকা, প্রচারণা ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ককে ফাঁস করেছে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের মুখোশ উন্মোচনকারী এই বিকল্প সংবাদমাধ্যম।

অধ্যাপক গ্রেগরি বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘কিভাবে নির্বাচনি প্রচারণাগুলো আয়োজন করা হয় এবং অর্থায়ন করা হয়, নোংরা কৌশলের ভূমিকা এবং কিভাবে নোংরা কৌশল প্রয়োগ করা হয়, যেভাবে লেনদেন হয়, প্রচারণার সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্ক, প্রচারণাকারী দলগুলোর অভ্যন্তরে থাকা পরিবর্তনকামী শক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো বোঝার ক্ষেত্রে উইকিলিকসের উপকরণের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

২০১০ সালে মার্কিন গোপন কূটনৈতিক নথি ফাঁস করে আলোচনায় আসা উইকিলিকস এবার মার্কিন নির্বাচনকে টার্গেট করে বিপুল নথি ফাঁস করেছে। উন্মোচন করেছে কথিত মার্কিন গণতন্ত্রের মুখোশ। ডেমোক্র্যাট মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন এবং ডেমোক্র্যাট ন্যাশনাল কনভেনশনের বিপুল পরিমাণ গোপন তথ্য ফাঁস করে তারা জড়িয়ে গেছে এবারের মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসের সঙ্গে।

গ্রেগরির মতে, উইকিলিকস তাদের হাজার হাজার পৃষ্ঠাজুড়ে যেসকল ইমেইল ফাঁস করেছে সেগুলোকে ইতিহাস বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তার দাবি, তথ্য ফাঁসের উৎসস্থলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বৈরি দেশ হলেও ফাঁস হওয়া ডাটাগুলো একটি স্বল্পকালীন ঘটনাপ্রবাহকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের উপকরণ হিসেবে কাজ করবে।

এ বছর মার্চ মাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের ৩০ হাজারেরও বেশি ইমেইল ফাঁস করে উইকিলিকস। এর মধ্য দিয়ে লিবিয়ায় তার ভূমিকা স্পষ্ট হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে হিলারি কীভাবে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাতে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন তা জানা যায় ওইসব মেইল থেকে। গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির কনভেনশনের আগে কমিটির সদস্যসহ বেশ কয়েকজনের ১৯ হাজারেরও বেশি ইমেইল ফাঁস করে উইকিলিকস। হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্সকে দমিয়ে রাখতে কমিটির নেতারা কি ছক কষেছিলেন, তা জানা যায় ওইসব মেইল থেকে। সম্প্রতি হিলারির প্রচারণা শিবিরের উপদেষ্টা জন পোডেস্টার ইমেইলও ফাঁস করা হয়। অক্টোবরে প্রকাশিত হিলারির ১ হাজার ৭০০ ই-মেইল থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি লিবিয়া ও সিরিয়ায় অস্ত্র পাঠানো এবং আইএস ও আলকায়েদার কাছে অস্ত্র বিক্রির ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ গোল্ডম্যান শ্যাস-এ দেওয়া হিলারির ভাষণ প্রকাশ করে উইকিলিকস। সোমবার (১৭ অক্টোবর) রাতে উইকিলিকসের এক অফিশিয়াল টুইটার বার্তায় জানানো হয়, ‘আমরা নিশ্চিত করছি, শনিবার গ্রিনিচ মান সময় ৫টায় গোল্ডম্যান শ্যাস-এ দেওয়া ক্লিনটনের ভাষণ প্রকাশের কিছুক্ষণ পরই ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।’ হিলারির বিষয়ে ফাঁস করা ইমেইলের দশম খণ্ডে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান শ্যাস-এ দেওয়া তার কয়েকটি ভাষণ রয়েছে। ওই প্রতিটি ভাষণের জন্য হিলারি পেয়েছেন দুই লাখ ২৫ হাজার ডলার করে।

আর নির্বাচনের দুই দিন আগে তারা আবারও ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনের ইমেইল ফাঁস করতে শুরু করে।

পল রোডেরিক গ্রেগরির মতে, উইলিকসের উপকরণগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি রাজনীতি বোঝা সহজ হবে। মার্কিন ম্যাগাজিন ফোর্বসে লেখা এক আর্টিকেলে এ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন গ্রেগরি। নিবন্ধে বলা হয়, ‘কিভাবে নির্বাচনি প্রচারণাগুলো আয়োজন করা হয় এবং অর্থায়ন করা হয়, নোংরা কৌশলের ভূমিকা কী এবং কিভাবে নোংরা কৌশল প্রয়োগ করা হয়, যেভাবে লেনদেন হয়, প্রচারণার সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্ক, প্রচারণাকারী দলগুলোর অভ্যন্তরে থাকা পরিবর্তনকামী শক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলো বোঝার ক্ষেত্রে উইকিলিকসের উপকরণের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

গ্রেগরির মতে, উইকিলিকস হলো একটি দুর্লভ সুযোগ। কৌশলগত ফাঁদের খবর গোপন রাখা যাবে এমন ধারণা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চালানো হবে না। তাদেরকে এখন আরও সতর্ক হতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় নোংরা কৌশল প্রয়োগের প্রবণতা বন্ধ হবে বলে আশা করেন গ্রেগরি।

এপ্রিলে বিকল্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম অল্টানেটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচক এবং বিশ্বজুড়ে জীবিত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জনপ্রিয়তম বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি বলেন, ‘সমাজের গণতন্ত্রায়নে ভূমিকা রাখছে উইকিলিকস।’ চমস্কি মনে করেন এটি জনিপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতদের বিভিন্ন জনবিরোধী ভূমিকা উন্মোচন করেছে। গোপন  তথ্য ফাঁসের মধ্য দিয়ে তারা ওইসব তথ্যে জনসাধারণের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করেছে। চমস্কি বলেন এইসব কারণে, ‘উইকিলিকস বিভিন্ন দেশের সরকার ও কর্পোরেশনগুলোর আক্রমণের স্বীকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারা উইকিলিকসকে যেনতেন উপায়ে স্তব্ধ করে দিতে চায়। অ্যাসাঞ্জের বিচার অন্যায্য, কেবল সেটাই নয়। তাকে পুরস্কৃত করা উচিত।’

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার মতে উইকিলিকসের ফাঁস করা লাখ লাখ ইমেইল থেকে অনেকের মনে থাকা সন্দেহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হিলারির অবস্থান কী, এটা নির্ভর করে তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন তার ওপর। তিনি ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বললে একরকম বলেন। আবার জনগণের সঙ্গে আরেকরকম বলেন।

কেউ কেউ বলতে চাইছেন, ফাঁস হওয়া তথ্য ভোটারদের মধ্যে ভয়াবহতার জন্ম দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলতে চাইছেন, রাশিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়েই অ্যাসাঞ্জ এই কাজ করেছেন। সম্প্রতি ইকুয়েডার দূতাবাস তার ইমেইলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়েছে। উইকিলিকসের দাবি অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় মার্কিন সরকারের ভূমিকা রয়েছে।

ফাঁসকৃত ইমেইলগুলো বিশ্লেষণ করে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ভিত্তিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভক্স.কম-এর প্রতিবেদক জ্যাক চুচ্যাম্প জানান, ‘পলিটিকোর প্রতিবেদক হিলারির প্রচারণা প্রধান পডেস্টাকে একটি ইমেইল করেছেন। ওই মেইলে তিনি পলিটিকোর জন্য একটি প্রতিবেদন বানিয়ে তাতে পডেস্টার অনুমোদন চেয়েছেন। কিন্তু এটা ঠিক না। ¬এটা হলো প্রতিবেদনের ওপর সোর্সের নিয়ন্ত্রণ, যে কীভাবে তা লেখা হবে।’

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সাড়া জাগানো বিকল্প সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয় ২০১০ সালে। মার্কিন কূটনৈতিক নথি ফাঁসের মধ্য দিয়ে উইকিলিকস উন্মোচন করে মার্কিন সাম্রাজ্যের নগ্নতাকে। দুনিয়াজুড়ে আলোচনায় আসেন ওই সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলোর গোপন তথ্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দুনিয়াব্যাপী আধিপত্যবাদবিরোধী মানুষদের প্রতীকি কণ্ঠস্বরে পরিণত হন তিনি। তবে সাম্প্রতিক ব্যক্তিগত তথ্যফাঁসের অভিযোগ ওঠেছে উইকিলিকসের বিরুদ্ধে। যদিও অ্যাসাঞ্জ ও উইকিলিকস তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই প্রেক্ষাপেট মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কথা বলে ক’দিন আগে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইকুয়েডর সরকার।

মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার খবরটি নিশ্চিত করে এক বিবৃতি দেয়। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণ হিসেবে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম এমন কিছু মূল্যবান নথি ফাঁস করেছে উইকিলিকস’।বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে শ্রদ্ধা করে ইকুয়েডর’। তবে অ্যাসাঞ্জকে ইকুয়েডরে দেওয়া আশ্রয় বহাল থাকবে এবং তিনি নিরাপদ জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তার জীবন ও শরীরকে অক্ষত রাখা হবে বলেও আশ্বস্ত করে কর্তৃপক্ষ।

Check Also

রাখাইন সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ দখলে নিচ্ছে চীন

মিয়ানমারের রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিচ্ছে চীন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর বিষয়ে ইতোমধ্যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.