Home / on-scroll / জননিরাপত্তার জন্য ‘নব্য জেএমবি’ এখনো হুমকি

জননিরাপত্তার জন্য ‘নব্য জেএমবি’ এখনো হুমকি

11-1

গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দেশব্যাপী আতঙ্ক তৈরি করেছিল ‘নব্য জেএমবি’। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কথিত সামরিক শাখার প্রধানসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি নিহত হওয়ায় সংগঠনটি অনেকটাই বিপর্যস্ত। তা সত্ত্বেও আইএস মতাদর্শী এই গোপন সংগঠনটিকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গুলশান হামলার ১০০ দিনের মাথায় এই জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ জানালেন জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, এই মুহূর্তে গুলশান হামলার মতো বড় ধরনের হামলা চালানোর সামর্থ্য নেই নব্য জেএমবির। তাদের শক্তি ক্ষয় হয়েছে অনেক, জনবল ও নেতৃত্ব-সংকটে পড়েছে। তারপরও সংগঠনটি এখনো ছোটখাটো ঘটনা ঘটানোর সামর্থ্য রাখে।

তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে একটা আপাতত স্বস্তি এলেও কেউই পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয় বলে মনে করছেন জঙ্গিবিষয়ক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, অনুকূল পরিবেশ পেলে জঙ্গিরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তারা অল্প জনবল ও সাধারণ অস্ত্র নিয়েও বড় নৃশংসতা চালানোর চেষ্টা করতে পারে। গুলশান হামলায় মাত্র পাঁচজন তরুণ ভয়ংকর নৃশংসতা চালিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে তাঁরা খুব একটা আধুনিক অস্ত্রও ব্যবহার করেননি।

এ ছাড়া নব্য জেএমবির প্রধান ব্যক্তি কে, তিনি দেশের ভেতরে না বাইরে অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারেও পরিষ্কার কোনো ধারণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নেই। তবে সিরিয়ায় অবস্থানকারী একজন বাংলাদেশিকেসন্দেহে রেখেছে দেশি-বিদেশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।

নব্য জেএমবির বড় নেতাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত তামিম চৌধুরীকে (নারায়ণগঞ্জে নিহত) ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা ‘ডেপুটিদের’ চিহ্নিত করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তামিমের ওপরের সারির নেতা কে বা কারা আছেন, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই—সরকার জোরের সঙ্গে এ কথা বলে এলেও গত বুধবার অনলাইনে প্রকাশিত সিরিয়া-ইরাকভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নতুন সাময়িকীরুমাইয়াহতে তামিম চৌধুরীকে তাদের ‘বাংলার খিলাফতের সৈনিকদের সামরিক ও গুপ্ত হামলার সাবেক প্রধান’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র বলছে, জঙ্গিবিরোধী গোয়েন্দা কার্যক্রমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা তামিম চৌধুরীর বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ, কর্মকাণ্ড ও তাঁর সহযোগীদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পেয়েছে। তামিম নারায়ণগঞ্জের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামত থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের ২ আগস্ট ওপরের নেতাদের কাছে তামিমের পাঠানো একটি চিঠিতে সংগঠনের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। তাতে বলা হয়, তখন তাঁদের সদস্যসংখ্যা ছিল ৩০০। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন মুহাজির (যিনি সংগঠনের জন্য নিজ বাসস্থান ত্যাগ করেছেন), আশকারি (প্রশিক্ষিত জঙ্গি) ৬ জন, ৩ জন শ‌ুরা সদস্য, গণমাধ্যম দেখার দায়িত্বে ৩ জন, বোমা তৈরির কারিগর বা বিস্ফোরক বিষয়ে দক্ষ ২ জন, ছাত্র (প্রশিক্ষণার্থী) ৫ জন। অন্যরা সাধারণ সদস্য। এ ছাড়া তখন পর্যন্ত তাঁদের যানবাহন ছিল ২টি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের আগস্টের পর থেকে গুলশান হামলার আগ পর্যন্ত নব্য জেএমবির ১৫০ জনকে গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে ও বোমা তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে ১০ জন নিহত হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, পরবর্তী সময়ে যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তাতে তাঁরা মনে করছেন, গুলশান হামলার আগ পর্যন্ত এই সংগঠনটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য ৩০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করে। গাইবান্ধা ও বগুড়ার চরে তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন রায়হান ইবনে কবির ও মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম। এই দুজন পরে ঢাকার কল্যাণপুর ও রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছেন। গুলশান হামলার পর সর্বশেষ শনিবার পর্যন্ত র‍্যাব-পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে নব্য জেএমবির মোট ৩২ নিহত হন। তবে প্রশিক্ষিত ওই ৩০ জনের দলের ২১ জন এ পর্যন্ত নিহত হরয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হলি আর্টিজানে হামলা ও হত্যাযজ্ঞে অংশ নেওয়া পাঁচজনও রয়েছেন। বাকিরা বাইরে আছেন। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ নিতে চান, এমন আছেন ৩০ জনের মতো সদস্য। এর বাইরে কিছু সাধারণ সদস্য আছে।

এদিকে নব্য জেএমবির যে অস্ত্রভান্ডার, তাতে চারটি একে-২২ রাইফেল ও ১৪টি নাইন এমএম পিস্তল থাকার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে গুলশান হামলায় ব্যবহৃত তিনটি একে-২২ রাইফেল ও পাঁচটি পিস্তল পরে পুলিশ জব্দ করেছে। সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হয় আরও চারটি পিস্তল। এখন তাঁদের কাছে একটি একে-২২ রাইফেল ও পাঁচটি পিস্তল এবং কিছু বিস্ফোরকের মজুত আছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

ঙ্গিদের অনলাইন কার্যক্রম নজরদারি করে এমন একটি সূত্র জানায়, গুলশান হামলার আগে তামিম চৌধুরী বিভিন্ন সময় তাঁর ওপরের নেতৃত্বকে অস্ত্র ও অর্থের অভাবের কথা বলেছেন। এ বিষয়ে সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে ওপরের নেতৃত্ব থেকে তামিম সাড়া পেয়েছেন, এমন আলামত পাননি গোয়েন্দারা। গুলশান হামলার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে জঙ্গিদের স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং সেটা ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। তবে এ জন্য দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে যে অর্থ এসেছে, সেটার প্রেরককে এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

গুলশান হামলার ১০০ দিনের মাথায় নব্য জেএমবির বর্তমান সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এই জঙ্গি সংগঠনটির গত কয়েক বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা ব্যবহার করে গুলশান হামলা চালিয়েছিল। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মুখে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ অনেকে নিহত হন। এতে করে সংগঠনে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয় এবং নেটওয়ার্ক অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

অবশ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে যে জঙ্গিরা ঝিমিয়ে পড়েছে। কিন্তু এ সময়টাকে তারা পুনরায় সংগঠিত হওয়ার কাজে লাগাতে পারে। এমন নজির আছে।

এরই মধ্যে গত ২৪ সেপ্টেম্বর আইএস তার কথিত বার্তা সংস্থা আমাক-এ গুলশান হামলার ঘটনায় নিহত পাঁচ জঙ্গির ধারণকৃত বক্তব্যসহ একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এর ১০ দিনের মাথায় গত বুধবার আইএসের নতুন সাময়িকী রুমাইয়াহতে তামিম চৌধুরীর লেখা একটা নিবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে গুলশান হামলায় নিহত পাঁচ জঙ্গির ছবি দিয়ে তাঁদের শহীদ আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করা হয়। একই সঙ্গে আরও হামলার হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তার মতে, আইএস মতাদর্শ অনুসরণকারী নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ অনেকে পুলিশের অভিযানে নিহত হওয়ায় ও ধরা পড়ায় হতাশ কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখতে এ ধরনের লেখা ও ভিডিও প্রচার করছে।

জঙ্গিবিষয়ক আরেক বিশ্লেষক আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খানের মতে, এ ধরনের ভিডিও ও লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এবং নিহত জঙ্গিদের এভাবে মহিমান্বিত করা হয়ে থাকে নতুন সদস্যদের আকৃষ্ট করার জন্য। এভাবে অনুসারীদের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বার্তাও দেওয়া হয়। তাই জঙ্গিদের এ ধরনের বার্তাকে উপেক্ষা করা যাবে না, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে তাৎক্ষণিক একটা সাফল্য ও জনমনে স্বস্তি এসেছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে একটু শিথিলতা বা অনুকূল পরিবেশ পেলে এ ধরনের গোষ্ঠী আবার সংগঠিত হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

এ বিষয়ে মনিরুল ইসলামের মত হচ্ছে, নব্য জেএমবি এখনো হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে কিছু করার চেষ্টা করবে। তবে গুলশান হামলার মতো কিছু করার সামর্থ্য এখন তাদের নেই। ছোটখাটো ঘটনা ঘটানোর সামর্থ্য আছে, সেটা ঢাকার ভেতরে করতে পারবে না। ঢাকার বাইরেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ আছে।  সূত্র- প্রথম আলো

Check Also

হাসপাতালে টাকা দিতে না পারায় খোলা স্থানে সন্তান প্রসব

হাসপাতাল চত্বরে প্রসব বেদনায় চিৎকার করছেন এই নারী। অনেকেই দেখছেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছেন না। …