Home / আন্তর্জাতিক / মার্কিন নির্বাচন : যে প্রার্থীরা নেই আলোচনায়

মার্কিন নির্বাচন : যে প্রার্থীরা নেই আলোচনায়

a369১৮৬৯ সাল থেকেই হোয়াইট হাউস আবদ্ধ রয়েছে দ্বিদলীয় বৃত্তে। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের বাইরে প্রার্থীরা নির্বাচন করার অধিকার পেলেও এ পর্যন্ত তারা কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। নির্বাচনকালীন মূলধারার মার্কিন মিডিয়াও যখন দ্বিদলীয় ঘূর্ণিপাকে আবদ্ধ হয়ে থাকে, তখন এই প্রার্থীদের পক্ষে সামনে আসার সুযোগ থাকে খুবই কম। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ে এতো আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা আর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হলেও নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরা তেমন একটা আলোচনায় নেই। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আরও অন্তত ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সকল অঙ্গরাজ্যের ব্যালটে তাদের সবার নাম থাকবে না।

গ্রিন পার্টির জিল স্টেইন

দ্বিদলীয় প্রার্থীর বাইরে গ্রিন পার্টির জিল স্টেইন সবচেয়ে আলোচিত। পেশায় ডাক্তার এই প্রার্থী এর আগে ২০১২ সালে গ্রিন পার্টি থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন তিনি ০.৩৬ শতাংশ ভোট পেলেও নারী প্রার্থী হিসেবে তখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চার লাখ ৬৯ হাজার ১৫টি ভোট পেয়েছিলেন।

১৯৫০ সালের ১৪ মে জিলের জন্ম হয় শিকাগোতে এক রুশ ইহুদি পরিবারে। তিনি ১৯৭৯ সালে বিখ্যাত হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল থেকে ডাক্তারি পাশ করেন।

মার্কিন ব্যবস্থাকে জিল ‘ভীষণ দুর্নীতিগ্রস্ত দ্বিদলীয় ব্যবস্থা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিবাদী’ এবং ‘হিলারিকে দুর্নীতির রাণী’ বলেও উল্লেখ করেন। গ্রিন পার্টি ৪৪টি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।   যে কোন গ্রিন প্রার্থীর মতোই, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি র্যালফ নাদেরের বাস্তববুদ্ধি বিবর্জিত ও সর্বনাশা ২০০০ সালের প্রচারণার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। যে বিভাজন প্রকৃত উদ্দেশ্যকে চাপা দিয়েছে। স্টেইন বলেন তার নিজেকে প্রত্যাহার করার কোন পরিকল্পনা নেই, এমনকি যে সকল রাজ্যে হিলারি ও ট্রাম্পের মধ্যে ব্যবধান এক সুতার মতো মাত্র। গ্রিন পার্টি ৪৪ টি রাজ্যের ব্যালটে রয়েছে।

লিবারেটেরিয়ান পার্টির গ্যারি জনসন

লিবারেটেরিয়ান পার্টির গ্যারি জনসন ৫০ টি রাজ্যের ব্যালটেই আছে, আছে কলম্বিয়া ডিসট্রিক্টেও। গ্রিন পার্টির জিল স্টেইন থাকতে পেরেছেন ৪০ টি ব্যালটে। চব্বিশটি রাজ্যে কন্সটিটিউশন পার্টির ড্যারেল ক্যাসল আছেন তাদের ব্যালটে, ১১ টি রাজ্যে থাকছেন সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ইভান ম্যাকমুলান।

এই প্রার্থীদের কেউই মিডিয়া কভারেজে অগ্রগামী প্রার্থী হিসেবে আসেননি। তারা ভোট চেয়েছেন তাদের কাছে যারা কিনা বড় দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীতে সন্তুষ্ট নন। পোলিটিকোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উতাহে ২৪ শতাংশ ভোটার ম্যাকমুলানের সমর্থক।

কন্সটিটিউশন পার্টির ড্যারেল ক্যাসল

কন্সটিটিউশন পার্টির ড্যারেল ক্যাসল নিজেকে কড়া কন্সটিটিউশনিস্ট বলে দাবি করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা করার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছেন তা ব্যখ্যা করেছেন রেডস্টেটকে। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের সংবিধান ফিরিয়ে আনতে চাই, সংবিধানে যা লেখা আছে, দেশে তা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’

ক্যাসেল সংবিধানের প্রতি এতখানিই অনুগত যে, তিনি জাতিসংঘ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করারও প্রস্তাব করেন। কেননা, তার মতে, ‘এটা স্বাধীনতা ও মানুষের সম্মানের পরিপন্থী। আমেরিকার যে ধারণা, তা জাতিসংঘের সদস্যপদের সঙ্গে যায় না।’

ট্রাম্প বিরোধী ম্যাকমুলান

নির্দিষ্ট কোন দলের প্রতিনিধি নন ম্যাকমুলান, জিওপির ট্রাম্প বিরোধী অংশ তাকে সামনে এনেছে। তিনি ১১ টি রাজ্যের ব্যলটে আছেন, কিন্তু তার মনযোগ উতাহের দিকে। মরমন-প্রধান রাজ্যগুলোতে ভোটাররা ২০০৫ সালে ট্রাম্পের নারীলোলুপ বক্তব্যের অডিও ফাঁসের পর ম্যাকমুলানের দিকে ঝুঁকেছেন।

সাংবিধানিক রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত ম্যাকমুলান আশা করেন, ‘সাংবিধানিক ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে তা কংগ্রেস মনোনীত করবে, প্রেসিডেন্ট নন,আদালত বা আমলাতন্ত্রও যারা কিনা আইন প্রণয়নের প্রকৃত অধিকারী।’

তিনি নিজেও রিপাবলিকানদের মূল আদর্শে বিশ্বাসী, তিনি সীমান্ত সংরক্ষণ, অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন ইত্যাদির পক্ষে, কিন্তু তার অবস্থান ধ্রুপদী/মূল রিপাবলিকান আদর্শে, ট্রাম্পের মত বিতর্কিত নয়।

গভর্নর গ্যারি জনসন

নিউ মেক্সিকোর গভর্নর হিসেবে দুই বার দায়িত্ব পালন করেছেন গ্যারি জনসন। সম্ভবত তৃতীয় পক্ষের প্রার্থীদের মধ্যে সেরা অবস্থানে তিনিই আছেন। লিবারেটেরিয়ান বয়ানে গত কয়েক দশকে একেক সময় প্রান্তিক আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হলেও তিনি কমবেশি মূলধারাতেই ছিলেন।

তবুও জনসন একটি বিশেষ মুহূর্তে বৈধতা হারান, তা হচ্ছে ৮ সেপ্টেম্বর, যখন তিনি চোখ বিস্ফারিত করে বিভ্রান্তভাবে নতুন এক কথা বলেন, ‘আলেপ্পো, সেটা কী?’ হঠাৎ করেই এক গাঁজাখোর, স্বদেশী, জ্ঞানপাপী, বাউণ্ডুলে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে।

বাকি প্রচারণায় প্রতিবেদকরা সাফল্যের সাথে জনসনকে আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে সক্ষম হন, যখন কিনা তিনি প্রিয় কোন বিদেশি নেতার (এমনকি উত্তর কোরিয়ার নেতার) নাম বলতে পারেননি। প্রবল ক্ষোভের মুখেও এই তৃতীয় পার্টি প্রার্থী বীরের মতো প্রচারণাটিকে সঠিক পথে চালিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু লিবারেটেরিয়ান পার্টি যদি আদর্শগত আন্দোলন নাও হয়, কেবল একটি দল হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে যেতে চায়, তাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও চারটি বছর।

সমাজতন্ত্রী দলগুলোতে নারী নেতৃত্ব

ক্লিনটন যখন কোন বৃহৎ দলের প্রথম নারী প্রার্থী, তখন সোশ্যালিজম ও লিবারেশন পার্টি এবং সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই নারীর হাতে।তারা হলেন যথাক্রমে গ্লোরিয়া লারিভা এবং অ্যালিসন কেনেডি। এই দুই দলের কোনটিই ২০টির বেশি রাজ্যের ব্যালটে নেই।

এদের বাইরে আরও ২১ জন নারী ও পুরুষ প্রার্থী লড়ছেন এই নির্বাচনে। তবে তারা সবাই ৫টি অঙ্গরাজ্যে লড়ছেন।

জরিপে তৃতীয় দলের উত্থানের আভাস

গত সেপ্টেম্বরে নমুনায়নের দৈবচয়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ২,০১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে এক জরিপ পরিচালনা করে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাবলিক রিলিজিয়ন রিসার্স ইন্সটিটিউট (পিআরআরআই)। আরেকটি জরিপ পরিচালিত হয় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ওপিনিয়ন রিসার্চ সেন্টার এনওআরসি-এর তহবিলে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্স ওই জরিপটি পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার ১০৬০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু, জনমত ও ডেমোগ্রাফিক তথ্য নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার সেপ্টেম্বরে আরেকটি জরিপ সম্পন্ন করে। পিআরআরআই-এর জরিপের আভাস অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান পার্টির প্রতি মার্কিনিদের অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে। এখন ৬১ শতাংশ মার্কিনি নির্বাচন নিয়ে হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। প্রতি ১০ জনে ৬ জনেরও বেশি মার্কিনি মনে করেন, প্রধান দুই দলের কোনটিই মার্কিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে না।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্স-এর জরিপের ফলাফলেও এ বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ৭০ শতাংশ মার্কিনিকে হতাশা বোধ করতে দেখা গেছে। জরিপ বলছে, ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান এ দুই দলের প্রতিও মার্কিনিদের হতাশার মাত্রাটা প্রায় একই রকমের। জরিপে দেখা যায়, নির্বাচন নিয়ে অর্ধেকেরও বেশি মার্কিনি অসহায় বোধ করছেন। সমান সংখ্যক মানুষের মনে নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। দেশের রাজনৈতিক পদ্ধতির প্রতি আস্থার অভাব রয়েছে প্রতি ১০ জনে ৯ জন আমেরিকানেরই। আর রাজনৈতিক বিভক্তির বাস্তবতায় নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাহীনতার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই। রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং সরকারের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে দুই দলের অধিকাংশ সমর্থকই আস্থা রাখতে পারেন না।

Check Also

রাখাইন সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ দখলে নিচ্ছে চীন

মিয়ানমারের রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিচ্ছে চীন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর বিষয়ে ইতোমধ্যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.