Home / অর্থনীতি / মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিন

মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিন

%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%b6

হাতের নাগাল থেকে বহু দূরে চলে যাওয়া ইলিশ আবারও সাধ্যের মধ্যে আসতে শুরু করেছে। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়েছে বলে মৎস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারায় এ ধারাবাহিক সফলতা এসেছে। আসন্ন প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে পারলে এবং পরবর্তীসময়ে জাটকা নিধন রোধ করতে পারলে আগামী বছরও ইলিশের প্রাচুর্য থাকবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণীসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। এর অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। জিডিপিতে এই ইলিশের অবদান ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ ইলিশের পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণসহ সংশ্লিষ্ট নানা কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই এই ইলিশ রক্ষায় প্রধান প্রজনন মৌসুমে এ বছর আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার।

ইলিশ রক্ষায় সবাইকে সরকারের এই আইন মানতে হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক। তিনি জানিয়েছেন, এ বছরও যদি প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে পারি এবং পরবর্তীসময়ে জাটকা নিধন রোধ করতে পারি তাহলে আগামী বছরও ইলিশের প্রাচুর্য থাকবে।

মৎস্যমন্ত্রী জানান, সরকার দেশের ২৭টি জেলায় এই ইলিশ ধরার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের অংশ হিসেবে ২২ দিন চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, জামালপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী জেলার সব নদ-নদীতে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন নদীতে ইলিশ ধরা পড়লেও বিশেষ করে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর হচ্ছে ইলিশ অধ্যুষিত জেলা। এই জেলাগুলোর আশপাশের নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে তালা হয়েছে ইলিশের অভয়ারণ্য। সাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক এইসব জেলার আশপাশের নদীগুলোয় এসেই ডিম ছাড়ে। পদ্মাসহ চাঁদপুরের মেঘনা, ভোলার তেতুলিয়া, বরিশালের কীর্তনখোলা, পটুয়াখালীর পায়রা, আগুন মুখা, পিরোজপুরের বলেশ্বর এবং সন্ধ্যা নদীর মাছ সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ইলিশ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ১২৫টি উপজেলার বিভিন্ন নদীতে।

মৎস্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ২২ দিন ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, কেনাবেচা, পরিবহন, মজুদ, বিনিময়সহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এ সময় মাছের আড়ত, হাটবাজার ও বিপণি বিতানগুলোতে (চেইন শপ) অভিযান পরিচালিত হবে। মৎস্য মন্ত্রণালয় দেশের বিভিন্ন স্থানের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তিনি জানান, ভোলা জেলার মনপুরা, ঢলচর, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া কালিরচর ও মৌলভীরচরকে ইলিশের বিশেষ প্রজনন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব এলাকাতেও ইলিশ ধরা বন্ধে অভিযান চালানো হবে।

ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌ পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য অধিদফতর এ সময় সংশ্লিষ্ট স্থান, হাটবাজার, মাছের আড়ৎসহ নদনদীতে অভিযান পরিচালনা করবে। অভিযান চলাকালীন মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হবে।

মোহাম্মদ ছায়েদুল হক জানিয়েছেন, ৫ থেকে ৭ বছর আগেও দেশের সাধারণ মানুষ ইলিশ মাছ খেতে পারত না। মন্ত্রণালয়ের সময় উপযোগী উদ্যোগের ফলে আজ দেশের সর্বত্র ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। ১৫-২০ বছরের মধ্যে এবারই বাজার ছাড়িয়ে শহর, গ্রামগঞ্জের অলি-গলিতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। যা গরিব মানুষরাও সাধ্য অনুযায়ী কিনে খেতে পারছেন।

তিনি জানান, চান্দ্রমাসের ভিত্তিতে প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে গত বছর আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগে তিন ও পরের ১১ দিনসহ মোট ১৫ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। এবার আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগে চার ও পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারায় এ ধারাবাহিক সফলতা এসেছে। পাশাপাশি সরকারের জাটকা নিধন কার্যক্রম, মা-ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম, ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিতকরণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান—ইত্যাদি সময়োপযোগী কর্মসূচি ইলিশের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মা-ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সালে যেখানে এক হাজার ৪৪০টি অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানে ২০১৫ সালে চালানো হয় ৫ হাজার ২০৯টি অভিযান।

তারা আরও জানিয়েছেন, একটি মা-ইলিশের পেটের দুই ফালি ডিম থেকে সর্বনিম্ন দেড় লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত পোনা হতে পারে। মা মাছ এই ডিম পানিতে ছাড়ার পর পানির স্রোতে এগুলো পরস্পর থেকে আলাদা হতে থাকে। তবে এর সবগুলো থেকে পোনা হয় না। বেশির ভাগ নষ্ট হয়। তারপরেও দুই ফালি ডিম থেকে লাখ লাখ ইলিশের পোনার সৃষ্টি হয়। তাই ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছই নয়, জাতীয় সম্পদও বটে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন নদীতে মা ইলিশ ধরা পড়ে। এজন্য গত বছর ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৫ দিন করা হয়। এরপরও মা ইলিশ ধরা পড়ায় এবার এই সময় আরও ৭দিন বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়েছে।

ইলিশ বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা গেছে, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। ইলিশ উৎপাদনের এ সফলতা ধরে রাখার জন্য ইলিশ ধরা বন্ধ থাকাকালীন সময় দেশের ১৫টি জেলার ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার। প্রজনন মৌসুমে জেলেদের পুনর্বাসনের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ২০ হাজার মেট্রিক টন চালের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ টনের কম ইলিশ উৎপাদিত হতো। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন।  অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০০-০১ সালে ২ লাখ ২৯ হাজার ৭১৪ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু পরের অর্থবছরে উৎপাদন ৯ হাজার ১২১ টন কমে গেছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২ টনে নেমে আসে। এর পর জাটকা রক্ষা কর্মসূচিতে জোর দেয় সরকার। এতে উৎপাদন কিছুটা বাড়তে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯২১ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এর পর মা-ইলিশ না ধরার কর্মসূচি আরও জোরদার করলে ইলিশের উৎপাদন ৩ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়।

মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়। আর চলতি বছর উৎপাদন সাড়ে ৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

Check Also

রিজার্ভ চুরি : অর্থ ফেরত আনতে ম্যানিলায় কর্মকর্তারা

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে …