Home / আন্তর্জাতিক / হিলারিকে টপকে গেলেন ট্রাম্প

হিলারিকে টপকে গেলেন ট্রাম্প

a155নির্বাচনী দৌড়ের শুরু থেকেই জনসমর্থনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু যতই দিন ঘনিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী ভোটের, ততই নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। ভোটের মাত্র ছয় দিন আগে হঠাৎ করেই প্রথমবারের মতো তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের যৌথ জরিপ জানিয়েছে, হিলারির চেয়ে ১ পয়েন্ট এগিয়ে গেছেন ট্রাম্প। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন ৪৬ শতাংশ আর হিলারির সমর্থন ৪৫ শতাংশ।

ই-মেইল বিতর্ক নিয়ে হিলারির বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে, শুক্রবার মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কোমি এ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই নির্বাচনের রং বদলাতে শুরু করেছে। শুক্রবারের পর থেকে প্রায় সব জরিপেই হিলারির জনমত আগের চেয়ে অনেক কমে যাওয়ার আভাস মিলছে।

এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের সর্বশেষ জরিপে টেলিফোনে তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় টেলিফোন ও মোবাইল ফোনে প্রাপ্তবয়স্ক এক হাজার ৭৭৩ জন ভোটারের মতামত নেওয়া হয়। এর আগে রবিবার এই প্রতিষ্ঠান দুটির যৌথ জরিপে হিলারির চেয়ে ১ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। তবে বিবিসির জরিপে হিলারি ৪৯ শতাংশ এবং ট্রাম্প ৪৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন পেয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। আর এক সপ্তাহ আগেও হিলারির চেয়ে ১২ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিলেন ট্রাম্প।

৮ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে ই-মেইল বিতর্কের পুরো বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে হিলারি শিবির। তারা বলছে, ভোটের আগ মুহূর্তে এফবিআইপ্রধান এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আইন ভেঙেছেন। তবে ট্রাম্প শিবির এফবিআইয়ের এ উদ্যোগকে ‘সৎ ও সাহসিকতা’র উল্লেখ করে এর প্রশংসা করছে। ই-মেইল বিতর্কের বিষয়ে হিলারি নিজেকে শুরু থেকেই ‘নির্দোষ’ দাবি করে এলেও ট্রাম্প বলেছেন, হিলারির মতো ‘অপরাধী’ প্রেসিডেন্ট হলে সাংবিধানিক সংকট ঘিরে ধরবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

এফবিআইপ্রধান কোমির সমালোচনা করে হিলারির প্রচার শিবিরের ব্যবস্থাপক রবি মুক বলেছেন, হিলারির ই-মেইল বিতর্ক নিয়ে গত জুলাই মাসে এফবিআই যেখানে তদন্ত শেষ করে বলেছিল গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি, সেখানে এই মুহূর্তে আবার তদন্ত শুরুর ঘোষণা কোমির পক্ষপাতদুষ্ট আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। অথচ হিলারির ই-মেইল হ্যাকিং ও ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ না করা কোমির ‘দ্বৈত অবস্থান’কেই প্রকাশ করেছে।

রবি মুক অবিলম্বে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু ব্যাখ্যা ও হিলারির সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে ঠিক একই ধরনের আচরণ ট্রাম্পের প্রতি করার জন্যও কোমির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট হাউস অবশ্য এফবিআইয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। সোমবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জন আর্নেস্ট বলেন, কোমিকে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি বলেই মনে করেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কোমি মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন না বলেই হোয়াইট হাউস মনে করছে।

কোমি গত শুক্রবার বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় হিলারির ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভারে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগের ব্যাপারে তাঁরা আবার তদন্ত করতে যাচ্ছেন। গত জুলাই মাসে এই তদন্ত বাদ দেওয়া হলেও তাঁরা নতুন কিছু ই-মেইলের সন্ধান পেয়েছেন, যা ওই তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

২০১৫ সালে প্রথম হিলারির ব্যক্তিগত সার্ভারে ই-মেইল চালাচালির বিষয়টি ফাঁস হয়। অভিযোগ ওঠে, হিলারি তাঁর ব্যক্তিগত সার্ভার থেকে ৩৩ হাজার ই-মেইল মুছে ফেলেছেন। বিষয়টি নিয়ে এফবিআই দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত জুলাই মাসে জানায়, এসব ই-মেইলে গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকেই এই বিষয়কে হিলারির বিরুদ্ধে একটি বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প। জবাবে হিলারি বলে আসছিলেন, এফবিআই তো তদন্ত করে জানিয়েই দিয়েছে গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি।

কিন্তু এফবিআই বিষয়টি নতুন করে তদন্তের ঘোষণা দেওয়ায় শেষ বেলায় কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন হিলারি। বিপরীতে নির্বাচনী দৌড় শুরুর পর থেকেই ট্যাক্স ফাঁকি, অভিবাসী ও মুসলিমদের নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য, যৌন হয়রানির একের পর এক অভিযোগ ও টেলিভিশনে তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে হিলারির কাছে বিধ্বস্ত হওয়া ট্রাম্প যেন হঠাৎ করেই প্রাণ ফিরে পেলেন। তাঁর প্রচারশিবিরও বেশ ভালোভাবেই এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে উঠেপড়ে লেগেছে।

ই-মেইল বিতর্ক ভোটের ময়দানে বেশ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে হিলারি শিবির বলছে, এতে ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে না, তারা এরই মধ্যে হিলারিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। অবশ্য ভোটারদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ওহাইওর এক নারী ভোটার বলেন, ‘এফবিআইয়ের নতুন তদন্ত আমার মতো অন্য ভোটারদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আমি এখন ট্রাম্পকে ভোট দেব।’ আরেক ভোটার বলেন, ‘আমি কোনো পরিবর্তন দেখছি না। ই-মেইলে তেমন কিছু নেই বলে আগেই জানা গেছে। আমি হিলারিকেই ভোট দেব।’

ভোটারদের মন জয় করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন হিলারি ও ট্রাম্প। সোমবার হিলারি নির্বাচনের অন্যতম লড়াইয়ের ময়দান পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওহাইওতে এবং ট্রাম্প মিশিগানে প্রচারসভা ও র‌্যালিতে অংশ নেন। সভায় ভোটারদের উদ্দেশে হিলারি তাঁর ই-মেইল বিতর্কের বিষয়ে বলেন, ‘আমি জানি আপনারা সচেতন। আমি স্বীকার করি, এটা একটা ভুল ছিল। তারা (এফবিআই) এখন আমার স্টাফদের একজনের পিছু নিয়েছে। এর আগে তারা একবার তদন্তে যা পেয়েছিল, আমি নিশ্চিত এবারও তাই পাবে। এর মধ্যে কোনো গোপন কিছু নেই।’ কোনো রকম তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই এফবিআই নির্বাচনে জড়িয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য’—এ মন্তব্য করে হিলারি বলেন, ‘আমি এমন একজনের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি, যিনি চান আরো মানুষের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকুক। ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার ও উপযোগিতা জানতে চেয়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগে তাঁর দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডার ইন চিফ হওয়ার মতো সঠিক মেজাজ কি ট্রাম্পের আছে? তিনি কিভাবে সংকট মোকাবিলা করবেন? আমাদের মিত্র ও শত্রুদের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে কি তিনি জানেন? আমাদের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের কোড বা চাবি যেখানে, এর কাছাকাছি ট্রাম্পের আসা উচিত নয়। কারণ তিনি পারমাণবিক যুদ্ধের বিষয়ে তোয়াক্কা করেন না।’

অন্যদিকে মিশিগানে প্রচারসভায় ট্রাম্প বলেন, হিলারির ই-ইমেইলে এফবিআই বড় ধরনের অনিয়মের সন্ধান পেয়ে থাকতে পারে। মার্কিন জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে রাষ্ট্রীয় গোপন ই-মেইল তিনি নিজের ব্যক্তিগত সার্ভারে চালাচালি করেছেন। এ কেলেঙ্কারির জন্য তাঁকে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। পুলিশ তদন্তে থাকা অবস্থায় তাঁকে প্রেসিডেন্ট করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হবে। এটি সাংবিধানিক সংকট তৈরি করবে। তিনি যত দিন ক্ষমতায় থাকবেন তার পুরোটা সময় তাঁর ই-মেইল তদন্ত ছায়া ফেলবে প্রশাসনে। হিলারি বারবার আইন ভেঙেছেন বলেও ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, রয়টার্স, ওয়াশিংটন পোস্ট।

Check Also

রাখাইন সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ দখলে নিচ্ছে চীন

মিয়ানমারের রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিচ্ছে চীন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর বিষয়ে ইতোমধ্যে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.